1065>|| বিজয়া সম্মিলনী- 2025 ||
1065>|| বিজয়া সম্মিলনী- 2025 ||
<----আদ্যনাথ--->
বিজয়া সম্মিলনী আমাদের এক হৃদ্যতা পূর্ণ আলিঙ্গনের অনুষ্ঠান।
কথায় আছে বাঙালির 12 মাসে 13 পার্বন।
হরেক পার্বন বাঙালির চিরন্তন,
বাঙালির মন বাঙালির পুজো পার্বন
চলতে থাকুক আজীবন।
এটা সত্যি যে আমরা নানান অনুষ্ঠান
করলেও বিজয়া দশমী আমাদের এক বিশেষ অনুষ্ঠান বা উৎসব।
এই উৎসব শুরু হয় মা মাসি পিসি সকল এয়ো-স্ত্রী গণের ‘মা’দুর্গার বরণ ও সিঁদুর খেলা দিয়ে।
সিঁদুর হল স্বয়ং ব্রহ্মার প্রতীক। এয়ো-স্ত্রী গণ একে অন্যের সিঁথিতে সিঁদুর পড়িয়ে দেন অর্থাৎ একে অন্যের স্বামীর দীর্ঘ জীবনের কামনা করেন। এই সিঁদুর খেলার পরেই ‘মা’ দুর্গা প্রতিমার নিরঞ্জন হয় ও শুরু হয় বিজয়া অনুষ্ঠান অথবা বিজয়া সম্মিলনী ।
এই বিজয়া সম্মেলন এমন এক সম্মেলন যে সম্মেলনে আমরা গুরুজনকে প্রনাম করি,আলিঙ্গন করি কাউকে নমস্কারও করি।
একমাত্ৰ এই বিজয়া অনুষ্ঠানেই আবলবৃদ্ধবনিতা সকলেই হৃদয় পূর্ন আনন্দ উপলব্ধির মধ্যদিয়ে অতিবাহিত করি। সকলেই যেন এক আনন্দ স্রোতে ভেসে চলে। অতএব বিজয়া অনুষ্ঠান আমাদের সর্বশ্ৰেষ্ঠ সামাজিক অনুষ্ঠান।
এ যেন হৃদয়ের মিলন উৎসব। শুধু প্রনাম , নমস্কার, আলিঙ্গন করেই শেষ হয়না এমন উৎসবের।
, এর সাথে থাকে নানান আনন্দ , উচ্ছ্বাস এবং প্রাণবন্ত শক্তির একটি অসাধারণ মিশ্রণ, সাথে মিষ্টি মুখ অর্থাৎ নানান মিষ্টি দিয়ে আপ্যায়ন এই বিজয়া উৎসবের বিশেষ রীতি।
মনেপরে ছোট বেলায় বিজয়া দশমীর দিনে আমরা পাড়ার প্রত্যেক বাড়িতে যেতাম বিজয়া করতে। কারুর বাড়িতে গিয়ে গুরুজনদের প্রনাম করলেই পাওয়া যেত হাত ভর্তি নাড়কেলের নাড়ু, কুচনিমকি, কেউ দিতো গুজিয়া, বোদে, খেতে খেতে পেট ভরে গেল প্যাকেটে বা কাগজের ঠোঙায় করে নিয়ে ঘরে এসে জমিয়ে রাখতাম। বেশ কদিন ধরে খেতাম। কেউ কেউ আদর করে ঘুগনি, চানাচুর দিত, এত মিষ্টি খাবার পরে ঘুগনি বা চানাচুর ভীষণ ভালো লাগতো। বার বার চেয়ে চেয়ে খেতাম। খাবার জিনিষ চেয়ে খেলে বাড়ির দিদিমা, জ্যেঠিমা, কাকিমারা ভীষণ খুশি হতেন। সে সময়ে যে যত বেশি খেতে পারতো তার ততই আদর ছিল। সে এক ভীষণ মজার দিন ছিল। আজ আর সেই দিন নাই, সব যেন কেমন ফুরিয়ে গেছে। সেই একান্নবর্তি পরিবারই আজ আর নাই, সেই বাড়ি বাড়ি গিয়ে নাড়কেল নাড়ু ,বাতাসা, হাত ভোরে কুচ নিমকি সে সকলও আর নেই।
আজ নাড়কেল নাড়ু ও দোকানে কিনতে হয়।
বিজয়া দশমী কিছু পৌরাণিক বীরত্ব ও ঐতিহ্যেকে সন্মান জানবার রীতি।
বাংলার বাইরে ভারতের অন্য প্রান্তে বিজয়া দশমীকে দশেরা হিসাবে পালন করা হয়। অশুভ শক্তির বিরুদ্ধে শুভশক্তির জয় অর্থাৎ অশুভ রূপে রাবণ দহন করা হয়।
পূরাণের তথ্য অনুযায়ী, টানা ৯ দিন ৯ রাত্রি যুদ্ধের পর শুক্লপক্ষের দশমী তিথিতে দেবী দুর্গা মহিষাসুর রুপি ভয়ঙ্কর অসুরকে বধ করেছিলেন এই দশমী তিথিতে তাই তিথি অনুযায়ী এই তিথিকে বলাহয় বিজয়া দশমী।
তবে আমাদের বাংলায় বিজয়া দশমী তিথি একটু অন্যরকম, এইদিন উমা তথা 'মা' দুর্গার বিদায়বেলা।
একসময়ে এই দিনে বাংলায় নীলকণ্ঠ পাখি ওড়ানো হত। কোথাও আবার তোপ দেগে, কামান চালিয়ে, বন্দুক চালিয়ে মাকে বিদায় জানানো হত।
কিন্তু সব জায়গাতেই বিজয়ায় মিষ্টিমুখ, কোলাকুলি, বড়দের প্রণাম, ছোটদের আশীর্বাদের পালা একই রকম।
সেদিন অধিকাংশ পুজোই হতো পারিবারিক। আজ সবটাই বারোয়ারী জাকমজমক পূর্ন ধুমধারাক্কা। সকলেই থিম নিয়ে ব্যস্ত। থিম টাই আজকের পুজোর ভাবনা ও ভক্তি। তাতে যে ক্লাবের যেমন আর্থিক শক্তি।
তখন পাড়ার ঠাকুর দেখতে গেলে অনেক হাটতে হতো । আমরা চার দিনে অনেক এলাকা ঘুরে খুব বেশি হলে তিন কি চারটি ঠাকুর দেখতে পারতাম।
আজ কিন্তু পুজোর সংখ্যা অনেক গুনে বেড়েছে।
বেড়েছে পুজোর রীতি নীতি,
আজ পাড়ায় পাড়ায় ক্লাবে ক্লাবে পুজো হয়।
আজ চারিদিকে থিমের পুজো হয়।
আজ থিম ছাড়া পুজো ভাবাই যায় না।
আজকাল পুজো মানেই বিপুল অর্থব্যয় ও আর্থিক শক্তির প্রদর্শনী।
তবে একথা অতি সত্য যে ফুল তুলসী বেলপাতা ছাড়া কোন পূজাই সম্ভব নয়
বিশেষ করে দুর্গা পূজায় মায়ের আরাধনা পূজা জাগ যজ্ঞ সকল কিছুতেই ফুল,তুলসী, বেলপাতা, অতি আবশ্যক ও মহত্বপূর্ন উপকরণ।
আর সমগ্র কলকাতা হাওড়া জুড়ে এই ফুলের যোগান দেয় আমাদের মল্লিক ঘাট ফুলের বাজার।
কলকাতা ও হাওড়ার সংযোগ স্থলে হাওড়া ব্রিজের নিচে , গঙ্গার পারে।
এশিয়ার বৃহত্তম ফুলের বাজার সমগ্র বিশ্বের মধ্যে সর্ব বৃহত্তম ফুলের বাজার।
এই বাজারটি শুধু কলকাতার জন্য নয়, সারা ভারত ও এমনকি আন্তর্জাতিক স্তরেও ফুল সরবরাহ করে। এটি ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক কাজের জন্য ফুল সরবরাহের প্রধান কেন্দ্র।
এই বাজারটি আনুমানিক ১৮৫৫ সাল
থেকে চালু আছে এবং প্রায় ১৭০ বছরের ধরে চলছে এই বাজার
এখানে গোলাপ, গাঁদা, গ্ল্যাডিওলি, চন্দ্রমল্লিকা, অর্কিড ও পদ্মসহ বিভিন্ন ধরনের স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক ফুলের বিশাল সমাহার দেখা যায়।
তবে এ হেন ফুলের বিশাল চাহিদা মেটাতে ও সকল স্থানে ফুল সরবরাহ করতে ফুল চাষী থেকে পাইকারী, ও খুচরো ব্যবসায়ী হাজার হাজার মানুষের রুজি রোজগার হয় এই ফুলের
যোগানে। এভাবেও কিছু মানুষের দিন গুজার হয়।
আজপুজোতে ইঞ্জিনিয়ার থেকে বিজ্ঞানী সকল শ্রেণীর মানুষের যোগদান থাকে।
যে যার মতন থিম নিয়ে ভাবনা চিন্তা করেন বৎসর ভর। আর তাঁদের সেই
চিন্তা, কায়িক ও মানসিক শক্তির প্রয়োগেই গড়ে ওঠে এক একটি থিমের
পূজা পেন্ডেল। আর এদের সঙ্গে যুক্ত হয়ে প্রতিদিনের খেটে খাওয়া মানুষেরা দু-পয়সা পায়।
আর এভাবেই আমাদের দুর্গা পূজা আজ বিশ্বরের দরবারে স্থান অধিকার করে নিয়েছে ইউনেস্কোর সহায়তায়।
আর আমরাও প্রতিবৎসর বিজয়া সম্মিলনী উপলক্ষে একত্রিত হয়ে প্রাণ খুলে একটু কথা বলার সুযোগ পাই।
নমস্কার।
<-----আদ্যনাথ রায় চৌধুরী--->
========================
Comments
Post a Comment