1024>|| চাঁদের গায়ে চাঁদ লেগেছে ||
1024>|| চাঁদের গায়ে চাঁদ লেগেছে ||
<----আদ্যনাথ --->
চাঁদের গায়ে চাঁদ লেগেছে,
আমরা ভেবে করব কি?
ঝিয়ের পেটে মায়ের জন্ম,
তাদের তোমরা বলবে কি?
ছয় মাসের এক কন্যা ছিল,
নয় মাসে তার গর্ভ হল,
আবার এগার মাসে তিনটি সন্তান,
এগার মাসে তিনটি সন্তান,
কোনটা কোরবে ফকিরি।
চাঁদের গায়ে চাঁদ লেগেছে,
আমরা ভেবে করব কি?
চাঁদের গায়ে চাঁদ লেগেছে।
ঘর আছে তার দুয়ার নাই,
লোক আছে তার বাক্য নাই গো,
হায় হায় লোক আছে তার বাক্য নাই গো।
আবার কে বা তাহার আহার যোগায়,
কে বা তাহার আহার যোগায়,
কে দেয় সন্ধ্যাবাতি।
চাঁদের গায়ে চাঁদ লেগেছে,
আমরা ভেবে করব কি?
চাঁদের গায়ে চাঁদ লেগেছে।
লালন ফকির ভেবে বলে,
ছেলে মরে মাকে ছুলে গো,--
হায় হায় ছেলে মরে মাকে ছুলে গো,--
আবার এই তিন কথার অর্থ নইলে,
এই তিন কথার অর্থ নইলে
তার হবেনা ফকিরি।
চাঁদের গায়ে চাঁদ লেগেছে,
আমরা ভেবে করব কি?
চাঁদের গায়ে চাঁদ লেগেছে।
================
গানটি লালন ফকিরের রচনা।
অনেকে মনে করেন যে লালন ফকিরের গুরু সিরাজ সাঁই এর নির্বিকল্প সমাধি হলে সেই অবস্থা দেখে এবং পরবর্তীতে সিরাজ সাঁই এর বর্ণনা শুনে লালন ফকির এই গানটি রচনা করেছিলেন।
এখানে আধ্যাত্মিক সাধারণের শ্রেষ্ঠ ও চরম প্রাপ্তির সামান্য অনুভব বর্ননা করা হয়েছে।
"চাঁদের গায়ে চাঁদ লেগেছে"-- অর্থাৎ পরমাত্মার সাথে জীবাত্মার মিলন হয়েছে- নির্বিকল্প সমাধিতে পরমাত্মা-জীবাত্মা ঐক্য বোধ হয়। ঐ অবস্থা জীব বাইরে থেকে বুঝতে পারে না।
"ঝিয়ের পেটে মায়ের জন্ম/ তারে তোমরা বলবে কি?"---অর্থাৎ জীবই ঈশ্বর হয়ে গেছেন। অসীম অনন্ত সীমার মধ্যে অবতীর্ণ হয়েছেন আর সীমার মধ্যে অসীমের উল্লাস প্রকাশিত হয়েছে। অর্থাৎ মানুষের মধ্যে সেই পরম চৈতন্যের প্রকাশ হয়েছে। এমন অবস্থাকে কোনো বাক্য বা বুদ্ধি দিয়ে বিচার করা যাবে না।
এর পরের লাইনেই সাধন রহস্য উদঘাটন করেছেন,
"6 মাসের এক কন্যা ছিল, 9 মাসে তার গর্ভ হলো। 11 মাসে 3 সন্তান।"---অর্থাৎ
6মাসের এক কন্যার অর্থ-->ষড়রিপু- কাম, ক্রোধ, লোভ, মদ,মোহ ও মাৎসর্য্য- এগুলো যখন সাধক/সাধিকা নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন। তখন তাঁর নবদ্বার অর্থাৎ
9 মাসে তার গর্ভ হলো:;---
( দুই চোখ, দুই কান, দুই নাসিকা রন্ধ্র, মুখ, পায়ু ও উপস্থ) রুদ্ধ অর্থাৎ বন্ধ হয়ে যায়। খুলে যায় 10 ম দ্বার আজ্ঞাচক্র। তারপর11মাসে 3 সন্তান::--- একাদশ দ্বার ব্রহ্মরন্ধ্র অর্থাৎ সহস্রার চক্র। তখন তিনি সিদ্ধি লাভ করেন। এই সিদ্ধি স্বরূপ তার মধ্যে কর্ম,জ্ঞান ও প্রেমরূপ তিন সন্তানের জন্ম হয়।
এর পরেই অদ্ভুত সেই নির্বিকল্প সমাধির বর্ণনা করেছেন।
" ঘর আছে তার দুয়ার নেই/ লোক আছে তার বাক্য নেই।কে বা জোগায় আহার/কে বা জ্বালায় সন্ধ্যাবাতি?"---->
অর্থাৎ দেহরূপ ঘর আছে কিন্তু নবদ্বার থাকায় তাতে বর্হিজগতের কোনো কিছুর প্রভাব নেই। মানুষটি বেঁচে আছেন অথচ তিনি চুপ হয়ে গেছেন মৌনতার গভীরে বোধের জগতে। তাঁর ভিতরে প্রাণের কোনো লক্ষণ নেই - শ্বাস প্রশ্বাস, খাওয়া দাওয়া বা বাহ্যক্রিয়া, হৃৎস্পন্দন এইসব কিছুই নেই। অথচ তিনি বেঁচে আছেন।
" ফকির লালন ভেবে বলে ছেলে মরে মাকে ছুঁলে গো--/আবার এই তিন কথার অর্থ না জানলে হবেনা ফকিরি?"------>
অর্থাৎ জীবাত্মা যখন পরমাত্মায় মিলিত হয় তখন জীবত্বের নাশ হয় , তাঁর ভিতরে তখন শিবত্ব বা ঈশ্বরত্বের প্রকাশ হয়। তাই লালন ফকির বলছেন এই গানের অর্থ ও ভাব না জানলে তিনি ফকির অর্থাৎ বৈরাগী হতে পারবেন না।
গানটির কথা ও ভাবার্থ গুরু পরম্পরায় প্রাপ্ত।
=======€€€€€€
"চাঁদের গায়ে চাঁদ লেগেছে"
বাউলদর্শনে রজস্বলা দশাকে বলা হয় অমাবস্যা, আর তৎপরবর্তী ডিম্বাণু নিঃসরণের কালকে বলা হয় চাঁদের উদয় । ইউট্রাস বা জরায়ু চন্দ্রাকৃতির, ডিম্বাণুও চন্দ্রাকৃতির, আর মানবশিশুকে চাঁদের সাথে তুলনা তো এক সনাতন উপমা ( চাঁদের কপালে চাঁদ টিপ দিয়ে যা ) । সুতরাং চন্দ্রাকৃতির জরায়ুতে চন্দ্রাকৃতির নিষিক্ত ডিম্বাণুর অবস্থানকে বলা হলো- চাঁদের গায়ে চাঁদ লাগা ।
কোরানের ভাষায়- "জায়ালনা-হু নুৎফাতান ফী কারারিম মাকীন" ( শুক্রাণু নিষিক্ত হয় ডিম্বাণুর সাথে ) ।
"ঝিয়ের পেটে মায়ের জন্ম"
ঝি মানে মেয়ে । আর যা থেকে আমাদের জন্ম, মূলত তাই তো আমাদের মা । সে হিসেবে আমাদের আদিমাতা লুকায়িত শুক্রে । যৌবন প্রাপ্তির পূর্ব পর্যন্ত দেহে শুক্রের অবস্থান অনির্ণেয় । যৌবন প্রাপ্তির পর এই দেহের অভ্যন্তরেই জন্ম হয় আদি মাতারূপী শুক্রের । এ যেন ঠিক ঝি বা কন্যার পেটে মায়ের জন্মের মতোই উল্টা ব্যাপার ।
" তিন মাসের এক কন্যা ছিলো
নয় মাসে তার গর্ভ হলো "
ওই "নুৎফাহ" বা নিষিক্ত ডিম্বাণু তিন মাসে একটা আকারপ্রাপ্ত হয়, যাকে কোরানে বলা হয়েছে "আলাকাহ", ( খালাকনান্ নুৎফাতা আলাকাতান- নিষিক্ত ডিম্বাণু বিবর্তিত হয় মাংসপিণ্ডে ) বিজ্ঞান যাকে বলছে "জাইগট" । গর্ভসঞ্চারকালে মা যেমন পূর্ণতাপ্রাপ্ত হন, ঠিক তেমনই এই জাইগট পূর্ণতাপ্রাপ্ত হয় নবম মাসে । কোরানে একে বলা হয়েছে- "আনশা'না-হু খালকান আ-খার" ( অবশেষে সেই অালাকাহ বা জাইগট সুন্দর অবয়বে পরিপূর্ণতা পায় ), যাকে লালন বলেছেন- " নয় মাসে তার গর্ভ হলো । " অর্থাৎ নবম মাসে সে পরিপূর্ণ হলো ।
" এগার মাসে তিনটি সন্তান
কোনটা করবে ফকিরি ? "
মানুষ মূলত এক মহাজাগতিক পরিব্রাজক । এই ভ্রমণের পথে সেই তিন মাসের জাইগট এগার মাসে এসে অর্থাৎ জন্মের দুই মাসের মাথায় আপন-পর ভেদ করতে শেখে, বিস্মিত হতে শেখে, বিচ্ছিন্নতাবোধের অনুভূতি আঁচ করতে শেখে । সেকারণে সে কখনো হাসে কখনো কাঁদে আপাতদৃষ্টিতে অকারণেই । এইযে
১। আপনভেদ
২। পরভেদ, এবং
৩। বিস্ময়বোধ
এরাই হলো এগার মাসের তিনটি সন্তান । এদের মধ্যে বিস্ময়বোধ প্রবল হলে সে আর সংসারী হতে পারে না । আপন-পরভেদ ঘুচে ফকিরি তাকে প্রবলভাবে টানে ।
ও
"ঘর আছে তার দুয়ার নাই
লোক আছে তার বাক্য নাই
কে বা তাহার আহার জোগায়
কে বা দেয় সন্ধ্যাবাতি ? "
মাতৃজঠর দরজা-জানালা বিহীন এমন এক বিস্ময়কর ঘর, যেটা নিষিক্ত ডিম্বাণু প্রবেশের সাথে সাথে বন্ধ হয়ে যায় । তার মধ্যে লোক থাকলেও কথা বলতে পারে না । আর কে যে কী উপায়ে আহার যুগিয়ে তার প্রাণপ্রদীপ প্রজ্জ্বলিত রাখে, সে এক অপার বিস্ময় ।
সেই জাইগট কালক্রমে যৌবনপ্রাপ্ত হয়, কাম জাগে । কাম জাগে মূলত আনন্দ প্রাপ্তির লক্ষ্যে । অথচ মানুষ শুক্রক্ষয়ের মাধ্যমে জীবনের সেই পরম আনন্দকে মাটি করে ফেলে । রামকৃষ্ণ পরমহংস দেব বলতেন, "মা'কে মাগী ভেবে মরিসনে", অন্য গানে লালন বলেছেন-
"কেনরে মন এমন হলি
যাতে জন্ম তাইতে মলি ? "
সুতরাং শুক্রকে উর্ধগামী করা বাউলের এক প্রধান লক্ষ্য এবং জীবনানন্দের গোড়ার কথা । শুক্রক্ষয়ের আগ পর্যন্ত ব্যাপারটা অপরিসীম আনন্দদায়ক, কিন্তু শুক্রক্ষয়ে শরীর মন দুইই অবসন্ন হয় । সেকারণেই বাউল দর্শনে শুক্র মা, শিশ্ন ছেলে, আর শুক্রপাত মৃত্যু । সুতরাং শুক্ররক্ষা বাউলের মূল লক্ষ্য । শুক্রধারণ ব্যতিরেকে বাউল ধর্ম হবে না । মা, ছেলে, আর মৃত্যুর এই তত্ত্ব না জানলে সে বাউল হতেই পারবে না। সুতরাং-
" ফকির লালন ভেবে বলে
ছেলে মরে মাকে ছুঁলে
এই তিন কথার অর্থ নইলে
তার হবে না ফকিরি । "
=================€€€€
আগেই বলেছি খুব জটিল তত্ত্ব। দেহ তত্ত্বে র মূল উৎস। কথায় বলে যা আছে ভান্ডে তাই আছে ব্রহ্মাণ্ডে। দেহ মন্দিরে আত্মারামের বাস। সেই মন্দিরে যে কত কত লীলা চলে সে রসিক জন ছাড়া কেউ বোঝে না। যদি সেই রসে ভেসে যাও তবে আনন্দ উপভোগ করতে পারবে না। কিন্তু তাকে যদি বশ করতে পারেন তাহলে সদানন্দ। নবযুগ বা এরকম কোন ও একটা পত্রিকায় অনেক দিন আগে পড়েছিলাম। ভালো লেগেছিল ,সংগ্রহে রেখেছিলাম। আপনাদের ও ভাগ দিলাম তার কিছুটা। এত টাইপ করে করে লেখা সম্ভব নয়। তবু যেটুকু হয়। চাঁদের গায়ে চাঁদ লেগেছে,
আমরা ভেবে করব কী,
ঝিয়ের পেটে মায়ের জন্ম,
তাকে তোমরা বলো কী।
শ্রোতাদের নিকট গানের প্রথম চার লাইন বিরাট জট পাকিয়ে ফেলে। ‘ঝিয়ের পেটে মায়ের জন্ম’ তেমনি এক জটিল ধাঁধাঁ! তাই প্রথমেই মনে রাখতে হবে বাউলরা তাদের তত্ত্বকথা প্রচলিত শব্দের মধ্যে গোপন রাখেন। প্রচলিত অভিধানে এই শব্দের যে অর্থ আমরা জানি, বাউলদের অভিধানে একই শব্দের অর্থ সম্পূর্ণ আলাদা। এই ভিন্নতাই বাউলদের স্বাতন্ত্র্যতা এনে দিয়েছে।
ঝি মানে কন্যা কিন্তু বাউল তন্ত্রে ঝি অর্থাৎ শরীর বা কায়া। মা অর্থাৎ যার থেকে জননী ,জনন জন্ম প্রক্রিয়া। এখানে শুক্র অর্থাৎ বীর্যের কথা বলা হয়েছে। বীর্য অর্থাৎ বীজ হলো জন্মের মূল তারমানে শরীরে বীর্যে র জন্ম। ঝিয়ের পেটে মায়ের জন্ম।ছয় মাসের এক কন্যা ছিল নয় মাসে তার গর্ভ হলো এগারো মাসে তিন সন্তান হলো। এও প্রতীকী। ছ মাসের কন্যা মানে ছয় রিপু। নয় মাসে গর্ভ মানে শরীরের নয় ছিদ্র। গর্ভ হওয়া মানে পুষ্ট হওয়া আর তিন সন্তান হলো শুক্র সুধা মধু। নয় ছিদ্রের সাথে শুক্রদ্বার ও রজ দ্বার মিলে এগারোর হিসেব। লালন সেই মেঝ অর্থাৎ মধু পান করছেন ফকিরি করবেন কি করে ?
মা কে ছুঁলে ছেলে মরে। মা অর্থাৎ শুক্র। ছেলে শিশ্ন । দুইয়ের যেন স্পর্শ না হয়। এখানে বীর্য সংযম বোঝানো হয়েছে।
দেহের মৃত্যু ওই বীর্যপাতের কারণেই। ওই আনন্দ র থেকে বেশি আনন্দ যদি আমরা দেহের ভিতর সেই পরম আত্মা কে জাগ্রত করি অনুভব করি।
রক্তকরবী নন্দিনী
====================
"চাঁদের গায়ে চাঁদ লেগেছে"🌙 এই গান নিয়ে বেশ বিতর্ক আছে স্বয়ং ! তবে এই গানের ঠিক অর্থ এখনো ঠিকভাবে কেউ বের করতে পারি নাই তবে অনেকটা করার চেস্টা করা হইছে আমার এই পোস্টে আমি চেস্টা করছি ঠিক অর্থটা দেয়ার। তবে এটা আদৌ ঠিক কিনা জানিনা 🤔 নানান মানুষের লেখা এবং নিজস্ব কিছু মতামত দিয়ে এই লেখাটাকে একটু জাতে তোলার চেস্টা করেছি মাত্র!
চাঁদের গায়ে চাঁদ লেগেছে
আমরা ভেবে করব কি
ঝিয়ের পেটে মায়ের জন্ম;
তারে তোমরা বলবে কে
প্রতীকী গানটিতে দুইটি চাঁদের কথা বলা হচ্ছে। দুটি চাঁদ হচ্ছে মাতা-পিতা তথা পুরুষ নারীর সূক্ষ্মস্বত্বা,যা সৃষ্টির সৃষ্টির শুরু। ‘চাঁদের গায়ে’ বলতে ‘মাতৃরজ ডিম্বাণু’ এর গায়ে ‘চাঁদ লেগেছে’ অর্থাৎ ‘পিতৃরজ শুক্রাণু’ লেগেছে।এখানে পুরুষ নারী মিলনে নতুন সৃষ্টির প্রতীকী ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছে।
========================
বাউল গানের অন্তর্নিহিত অর্থের মধ্যেও বহুত্ব লক্ষ্য করা যায়। একই গান সাধনার বিভিন্ন স্তরে বিভিন্ন অর্থ প্রকাশ করে। বাউলের ভাষায় ‘ একটি কথার চারটি অর্থ/ স্থুল, প্রবর্ত, সাধক, সিদ্ধ’।
চাঁদ বা চন্দ্র বাউল গানে একটি বহুল্প্রচলিত সাঙ্কেতিক শব্দ যা একাধিক অর্থ বহন করে। তন্ত্রে চন্দ্রের একটি অর্থ মন। আবার হঠযোগে চন্দ্র-সূরয দেহের ইড়া-পিঙ্গলা নাড়ী। বাউল গানে, লৌকিক তন্ত্রে চার চন্দ্রের উল্লেখ পাওয়া যায় যথা কামচন্দ্র, ভাবচন্দ্র, জ্ঞান চন্দ্র ও ধ্যান চন্দ্র বা গরল, উন্মাদ, রোহিনী ও মান চন্দ্র। সাড়ে চব্বিশ চন্দ্রের কথাও বাউল গানে ঘুরে ফিরে এসেছে। অনেকের মতে চার চাঁদ হল মানব দেহ নির্গত মল, মূত্র, রজ, বীজ আবার কারো মতে বৌদ্ধ তন্ত্রের চারটি চক্র যা মানবদেহে ধারণা করা হয়। গানটির মূল বিষয় মানব দেহ ও সৃষ্টি তত্ব। তাই অনুমান করা যায় ‘চাঁদের গায়ে চাঁদ লেগেছে অর্থে রজ-বীজের( ডিম্বানু-শুক্রানু) বা নারী-পুরুষের মিলনকে নির্দেশ করা হয়েছে। ঝি বা কন্যা রজবতী হলে তার মাতৃত্বের সূচনা ঘটে (‘ঝি কে মা যায় না বলা / না হলে তার রজস্বলা’- বাউল তরনী সেন মহান্ত)।
তন্ত্র মতে গর্ভাবস্থার ষষ্ঠ মাসে জীবের দেহে ষড় রিপুর প্রবেশ ঘটে, নবম মাসে নব দ্বার যুক্ত হয়। একাদশতম মাসে জন্মের পূরবে মন বুদ্ধি ও অহংকার এই তিন সন্তানের জন্ম। ভাব, ভক্তি ও বৈরাগ্য মনের ধর্ম তাই মনই ফকিরি করে।
"°================
চাঁদের গায়ে চাঁদ লেগেছেঃ চাঁদ নিজের নয়, সূর্যের অালোর প্রতিফলন, জীবচক্ষুতে ভিন্ন মনে হলেও সূর্যের অালোই চাঁদের আলো। তেমনি জীবদেহের জীবাত্মা ও পরমাত্মা উভয়ই পরমেশ্বরের প্রতিফলন। ঠিক যেন সূর্যরূপ পরমেশ্বরের প্রতিফলনে দুইটি চাঁদ। প্রকৃত সাধকই এই দুই চাঁদের (জীবাত্মা ও পরমাত্মার) মেলবন্ধন ঘটাতে সক্ষম হয়, অার তখন সে মানুষে অার পরমেশ্বরে কোন ভেদ থাকে না। সেই মানুষই বাউলের মনের মানুষ, বাউল সাধনার চূড়ান্ত লক্ষ্য। গানের পরবর্তী পর্যায়ে এই সাধনার পদ্ধতি রয়েছে।
ঝি এর পেটে মায়ের জন্মঃ ঝি অর্থাৎ সন্তান, মা অর্থাৎ জন্মদাত্রী। সাধারণ দৃষ্টিতে জীব পরমেশ্বরের সন্তান। সেই জীবদেহে সাধন বলে ঈশ্বরত্বের স্ফুরণ, ঠিক যেন সন্তানের গর্ভে মাতার জন্মের মতনই ঘটনা।
ছয় মাসের এক কন্যা.....ঃ ষড়রিপু তাড়িত মানবদেহ, নবগুণ অর্জন করলে সাধনার উপযুক্ত হয়(নয়মাসে গর্ভ হল), এরপর ত্রিগুণ (সত্ত্ব, রজ, তম) অতিক্রম করলে (৯+১১) এগারো মাস পার হল। এরপর তিনটি সন্তান, সাধনার তিনটি পথ-বাৎসল্য, মধুর, দাস্য ভাবের উদয় হল। এরপর সাধক বেছে নেন তিনি কোন ভাবের ফকির হবেন। (কোনটা করবে ফকিরি)।
ঘর অাছে তার দুয়ার নাই ঃ দেহ থাকবে, কিন্তু কামনার সকল দ্বার রূদ্ধ। সাধক জাগতিক সকল অাকাঙ্খার উর্ধ্বে। তার মধ্যে লোক আছে, অর্থাৎ জীবন অাছে কিন্তু জীবপ্রবৃত্তি নেই ( বাক্য নেই)। কিন্তু জীব প্রবৃত্তির পরিতুষ্টি ছাড়া বাঁচতে পারে না, তাহলে সাধক কিভাবে বেঁচে থাকে? (কেবা তাহার অাহার যোগায়, কে দেয় সন্ধ্যা বাতি?) এই প্রশ্নের উত্তর হল, এই অবস্থায় পৌঁছাতে পারলে সকল ইন্দ্রিয়াসক্তির উর্ধ্বে চলে যান, সেখানে সেই অায়নামহলে নিজের ব্রহ্মময় প্রতিবিম্বে এতটাই মোহিত হয়ে যান যে তিনি সর্বাবস্থায় চিরসন্তুষ্টি লাভ করেন। তার অার চাওয়ার কিছু থাকে না। তাই প্রবৃত্তির পাশ থেকে মুক্ত হয়েও তিনি ব্রহ্মানন্দে মেতে থেকে গাইতে পারেন, "যখন ঐ রূপ স্মরণ হয়, থাকে না লোক লজ্জার ভয়; লালন ফকির ভেবে বলে সদাই, লালন ফকির ভেবে বলে সদাই।
=======++++=========
Comments
Post a Comment